ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অনেকেই একটি অদ্ভুত সমস্যার সম্মুখীন হন — সকালে খালি পেটে সুগার পরীক্ষা করলে রেজাল্ট একদম স্বাভাবিক, কিন্তু খাবার খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর (Postprandial বা PP) পরীক্ষা করলেই রিপোর্ট অনেকটা বেশি আসে।
অনেকে এটাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেন না, কিন্তু এটি একটি সংকেত যা অবহেলা করা ঠিক নয়। এই অবস্থাকে বলা হয় Impaired Glucose Tolerance (IGT)। এটি মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক ধাপ বা প্রি-ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
আমাদের শরীর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ইনসুলিন নামক হরমোনের মাধ্যমে। যখন এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সূক্ষ্ম কোনো ত্রুটি দেখা দেয়, তখনই পিপি সুগার বেড়ে যাওয়ার সমস্যাটি দেখা দেয়।
কেন পিপি সুগার বেড়ে যায়?
সুস্থ মানুষের শরীরে খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই অগ্ন্যাশয় থেকে দ্রুত ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। কিন্তু যাদের পিপি বেশি আসে, তাদের শরীরে ইনসুলিন তৈরি হতে বা কাজ করতে দেরি হয়। ফলে খাবার থেকে পাওয়া গ্লুকোজ দ্রুত রক্তে মিশে গেলেও ইনসুলিন তা সময়মতো কোষের ভেতরে ঢোকাতে পারে না।
এর পেছনে মূলত চারটি কারণ কাজ করে:
- ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: শরীরে ইনসুলিন ঠিকই থাকে, কিন্তু শরীরের কোষগুলো সেই ইনসুলিনকে চিনতে পারে না বা সাড়া দেয় না। লিভার এবং পেশি রক্ত থেকে চিনি সরাতে ব্যর্থ হয়।
- ইনসুলিন নিঃসরণে দেরি: অগ্ন্যাশয় যথাসময়ে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, ফলে খাবার পর সুগার হঠাৎ বেড়ে যায়।
- দ্রুত শোষণযোগ্য কার্বোহাইড্রেট: সাদা চাল, ময়দা, চিনিযুক্ত পানীয় খুব দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই আকস্মিক চাপ শরীর সামলাতে না পারলে পিপি সুগার বেড়ে যায়।
- গ্লুকাগনের ভারসাম্যহীনতা: খাবার পর গ্লুকাগন নামক হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, যা যকৃৎ থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ রক্তে পাঠিয়ে দেয়।
কেন এটি অবহেলা করা ঠিক নয়?
অনেকে ভাবেন খালি পেটে সুগার নরমাল থাকা মানেই তারা পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষণ রক্তে উচ্চ মাত্রার পিপি সুগার থাকা নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে:
দীর্ঘমেয়াদী পিপি সুগার বেশি থাকলে হৃদরোগ, কিডনির জটিলতা এবং চোখের সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এমনকি এটি হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম একটি নীরব কারণ হতে পারে।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
আপনার যদি এই সমস্যা থাকে, তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। লাইফস্টাইলে কিছু ছোট পরিবর্তন আনলে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব:
- খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুন: সাদা ভাতের বদলে লাল চাল, ওটস, প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি এবং ডাল খাদ্যতালিকায় রাখুন।
- খাবার খাওয়ার ক্রম ঠিক রাখুন: প্রথমে সবজি, এরপর প্রোটিন (মাছ/মাংস/ডিম) এবং সবশেষে কার্বোহাইড্রেট (ভাত/রুটি) খাওয়ার চেষ্টা করুন। এটি সুগার স্পাইক রোধ করতে সাহায্য করে।
- খাবারের পর হাঁটুন: খাবার খাওয়ার ১৫-২০ মিনিট পর হালকা ১০-১৫ মিনিট হাঁটলে পেশিগুলো রক্ত থেকে সরাসরি গ্লুকোজ গ্রহণ করে, ফলে সুগার কমে আসে।
মনে রাখবেন, IGT বা প্রি-ডায়াবেটিস পুরোপুরি ফিরে আসার সুযোগ আছে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে পূর্ণ ডায়াবেটিসে রূপান্তর ঠেকানো সম্ভব।
শেয়ার করুন